নিউজ ডেক্স: রমজানের তৃতীয় দিন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটা। শহরের প্রবেশদ্বার রূপসা ঘাট এলাকা। ঘাটের চিরচেনা সেই প্রাণচাঞ্চল্য তখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। দু-একটা ট্রলারে মানুষ এপাড়-ওপাড় যাতায়াত করছেন। তবে ঘাটের একটু পাশেই দৃশ্যপট অন্য রকম। শত শত মানুষের হাঁকডাক। হাঁকাহাঁকির পাশাপাশি মাপজোখ, দরদামে সবাই মহাব্যস্ত। শ্রমিকেরা মাথায় মাছের ড্রাম নিয়ে ছুটছেন পাইকারের ঘরের দিকে। সেখানে বড়, মাঝারি, ছোট; সাগরের, জঙ্গলের, পুকুরের, বিলের—সব ধরনের মাছই আছে। পাইকারি দরে বিক্রি হওয়া মাছ চলে যাচ্ছে শহরের বিভিন্ন বাজারে। আবার বরফের চাঁইয়ের নিচে চাপা পড়ে বাক্সবন্দী হয়ে চলে যাচ্ছে শহরের বাইরে, অন্য জেলায়, অন্য শহরে। রূপসা ঘাটের পাশে অবস্থিত এই মাছ বাজারের নাম রূপসা পাইকারি মৎস্য আড়ত। বলা হয়ে থাকে, এটি খুলনা বিভাগ তো বটেই, পদ্মার এপারের সবচেয়ে বড় পাইকারি মাছের আড়ত। ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনায় সরগরম হয়ে ওঠে এই বাজার। সকাল নয়টার মধ্যে বেচাবিক্রি সব শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় দফায় আবার বাজার বসে বেলা একটায়। চলে তিনটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত। সকালবেলায় মূলত সাগরের মাছ, সুন্দরবনের নদীর মাছ আর আশপাশের উপজেলার দেশি প্রজাতির বিলের মাছ বেশি বিক্রি হয়। দুপুরের পাওয়া যায় মূলত লোনাপানির ঘেরের মাছ। চুয়াল্লিশ কেজিতে মণ হিসাবে সাদা মাছ বিক্রি হয়।
মাছ ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীর সুন্দরবনের নদীর নানা রকম মাছ সাজিয়ে বসেছিলেন। ক্রেতারা মাঝেমধ্যে দল ধরে এসে দরদাম করছিলেন। নানা রকমের চিংড়ি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, ভোলা মাছ ৩০০ টাকা এবং দাঁতনে মাছ ৪০০ টাকা কেজি দর হাঁকছিলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘মাছ বুঝে দাম। এই বাজারে কোনো মাছ ৩০ টাকা কেজি, আবার কোনোটা ৭০০ টাকা কেজি। মাছের মান, আকার ও স্বাদভেদে দাম নির্ধারণ করা হয়। ভোররাতে এখানে মাছ চলে আসে। কখনো নগদে, আবার কখনো বাকিতে বিক্রি করি। তবে আমাদের কাছে যাঁরা মাছ আনেন, তাঁদের নগদ টাকা দিয়ে দিই। আর এ জন্য শতকরা ৩ টাকা হারে আমরা কেটে রাখি।’
এই মাছ ব্যবসায়ী বলেন, বছরে ঈদের ২ দিন বাদে ৩৬৩ দিন এই বাজার চলে। এখানকার ক্রেতা মূলত খুচরা মাছ ব্যবসায়ীরা, যাঁরা মাছ নিয়ে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন। অল্প মানুষ পরিবারের জন্যও মাছ কিনতে আসেন। তবে এ বছর বাজারে মাছ অনেক কম। জঙ্গলে, ঘেরে মাছ কম হচ্ছে। আবার যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় অনেকেই মাছ আর এই আড়তে আনেন না।
বাজারে সাগরের ইলিশ, জাভা, ভেটকি, কলম্বো, মেদ, টুনা, রূপচাঁদা, বেলে, মোচন, চিংড়ি, ফোঁপা, লইট্টা, ভোলা; নদীর দাঁতনে, পারশে, ট্যাংরা, কাঁকড়া, চিংড়ি; স্বাদু পানির রুই, কাতলা, মৃগেল, পাবদার যেমন দেখা মিলল; তেমনি বিলের কই, শোল, টাকি, পুঁটিসহ নানা ছোট মাছের দেখাও পাওয়া গেল। আড়তের দক্ষিণ প্রান্তের একটি খোলায় (মাছ বিক্রির ঘর) একেকটি ১০ থেকে ২০ কেজি ওজনের কম করে ১৫টা কোরাল মাছ ঘিরে একটা জটলা দেখা গেল। সেখানে নিলামে তোলা হচ্ছে মাছগুলো। ক্রেতা অনুরোধ করছেন, দাম যেটাই উঠুক, সবাই যেন একটা আধটা করে অন্তত কিনতে পারেন। ওই মাছ ঘরের স্বত্বাধিকারী মো. আলিমুল রেজা বলেন, মাছগুলো পাথরঘাটা ও কয়রা থেকে এসেছে। এখনো প্রতি কেজি ৭৮০ টাকা পর্যন্ত দর উঠেছে। দর আরও বাড়ছে। খুলনা শহরের ৩৬টি মাছ বাজারের মাছ এই আড়ত থেকেই যা। মাছের যাতে সংকট না হয়, সে জন্য চট্টগ্রাম থেকেও সামুদ্রিক মাছ আনা হয়।
ওই আড়তের একাংশের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান বলেন, ঘের, সাগর, জঙ্গল আর বিলের মাছ এখানে মেলে। খোলাবাজার খোলাভাবে মাছ আসে। তবে আগের মতো জমজমাট নেই। এখানে আড়ত ১৬০টার মতো, তবে চালু আছে ৩০-৪০টি। এখন প্রতিদিন ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার বেচাকেনা হয়। ভরা মৌসুমে কিছু ভালো হয়। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গের বাজারেও এই মাছ যায়। এই বাজার মূলত দাকোপ ও কয়রার লোনা পানির ঘেরের মাছের ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। ওই দুই এলাকায় মানুষ ঘের বন্ধ করে তরমুজ করছে। এতে সংকট তৈরি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেছে। আড়তের আরেক অংশের সাধারণ সম্পাদক রমজান আলী হাওলাদারের হিসাবে, আড়তে এখনো প্রতিদিন কেনাবেচা কোটি টাকার ওপরে। শহরের ৩৬টি মাছ বাজারের মাছ এখান থেকেই যায়। আড়তে যাতে মাছের সংকট না হয়, সে জন্য চট্টগ্রাম থেকেও সামুদ্রিক মাছ আনা হচ্ছে।
বাজারের পেছনের দিকে একটি কোনায় ব্যাপক ভিড় আর বেশ শোরগোল। সেখানে ছোট ছোট তরকারি ধোয়ার ঝুড়িতে, হাতে এবং ছোট থালায় করে মাছ বিক্রি হচ্ছে। সেখানেও নিলাম ব্যবস্থা। ক্রেতারা মূলত নারী আর নিম্ন আয়ের মানুষ। কেউ পরিবারের জন্য কিনছেন, আবার কেউ এখান থেকে কিনে অন্য কোথাও বিক্রি করবেন। মূলত আড়তদারদের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া মাছ সেখানে বিক্রি হচ্ছে।
সাকিবুল হাসান নামের ছোট শিশু হাতে করে তিনটা ভোলা মাছ বিক্রির জন্য ৩০ টাকা দাম হাঁকছিল। আড়তে পানি এনে দেওয়ার বিনিময়ে মাছগুলো পেয়েছে সে। ২৫ টাকা দিয়ে মাছগুলো কিনে নেন হাসি বেগম। তিনি বলেন, ‘আমাদের রোজগার কম। এভাবে কয়েকজনের কাছ থেকে মাছ কিনব। এখানে কিছুটা সস্তা হয়। যদিও এই মাছের মান খুব ভালো থাকে না।’
মো. মারুফ নামের একজন থালায় মাছ নিয়ে দর হাঁকছিলেন। মারুফ বলেন, ‘আড়তে আমরা কাজ করে দিই। সামান্য কিছু টাকা পাই আর বেচা শেষে আমাদের কিছু খাওয়ার মাছ দেয়। সেই মাছই আমরা বিক্রি করে কোনোমতে পেট চালাই।’- প্রথম আলো
Dhaka
,
Friday, 18 September 2026
শিরোনাম :
বাগেরহাটে বসতবাড়ির তালা ভেঙে মূল্যবান মালামাল ও দলিলপত্র লুটের অভিযোগ
বাগেরহাটে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা
বাগেরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের মাঝে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ
৪০ কোটি টাকার পানি প্রকল্প অচল, পচা দিঘিতে মাছ শিকারের উৎসব
ড্রেন না থাকায় জলাবদ্ধতা, হুমকির মুখে ব্রিজ
ঋণের বোঝা, আ.লীগের ‘দায়’ বিএনপির ‘ঘাড়ে’
সমাজবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্তক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
বগুড়ায় প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় আহত নারীর মৃত্যু
বাগেরহাটে শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ
তানজিন তিশার বিরুদ্ধে মামলার সত্যতা পায়নি পিবিআই, বাদীপক্ষের নারাজি
রূপসার তীর সরগরম নানান মাছে
-
Md.Liton - আপডেট টাইম : 03:48:42 pm, Thursday, 7 April 2022
- 154 বার
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ












