Dhaka , Monday, 2 November 2026
শিরোনাম :
বাগেরহাটে জমি দখল ও হামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন বাগেরহাটে ইউনিয়ন বিএনপির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত বাগেরহাটে গ্রীন হার্ট স্কুলের বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, নজরুল বর্ষ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত বাগেরহাট পৌর যুবদলের আয়োজনে যুবদলের ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা বাগেরহাটে ১১ দলীয় ঐক্যের গণমিছিল ৩১ অক্টোবর, অংশগ্রহণের আহ্বান বাগেরহাট জেলা কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য ‘বৈদ্যুতিক ওয়ারিং ও রিপেয়ারিং’ প্রশিক্ষণ কোর্সের শুভ উদ্বোধন বাগেরহাটে মোটর সাইকেলের গতি রোধ করে বাংলালিংক ডিস্ট্রিবিউটরকে ছুরিকাঘাত ও ছিনতাই বাগেরহাটে স্কুল থেকে ফিরে এসএসসি পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যা ‘না বুঝে ভুল করেছি’ ক্ষমা চেয়ে শ্যালিকাকে ‘তালাকে’র ঘোষণা মাসুদের রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার পশ্চিমা চেষ্টা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ: মারিয়া জাখারোভা

খানজাহানের দিঘিতে কুমিরের হামলায় মেয়েকে হারিয়ে ৩ বছর পর পরিবারে ফিরলেন ফজিলা

  • Md.Liton
  • আপডেট টাইম : 07:51:07 pm, Thursday, 4 June 2026
  • 80 বার

বাগেরহাট প্রতিনিধি:একদিকে আট বছরের শিশুকন্যা ফাতেমাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে তিন বছর ধরে নিখোঁজ থাকা এক মাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.) মাজারকে ঘিরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যেই সামনে এসেছে এমন এক মানবিক গল্প, যা ছুঁয়ে গেছে দেশের মানুষের হৃদয়।

মাজার সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে নিহত শিশু ফাতেমার মা ফজিলা বেগমকে অবশেষে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ তিন বছর ধরে নিখোঁজ থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন ফজিলার খোঁজ মিলেছে মূলত মেয়ের মৃত্যুর মর্মান্তিক সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর।
যেভাবে নিখোঁজ ও মাজারের জীবন:

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরখরিচা গ্রামের বাসিন্দা ফজিলা বেগম প্রায় তিন বছর আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর বহু খোঁজাখুঁজির পরও তার সন্ধান পায়নি পরিবার। একসময় সবাই ধরে নিয়েছিল তিনি আর বেঁচে নেই।

স্থানীয়রা জানান, ফজিলা বেগম প্রায় দুই বছর ধরে খানজাহান আলী (রহ.) মাজার এলাকায় বসবাস করছিলেন। তার সঙ্গে ছিল ছোট মেয়ে ফাতেমা। মাজারের আশপাশে ঘুরে বেড়ানো মা-মেয়ের এই ছোট্ট পৃথিবী ছিল মাজারের খোলা আকাশের নিচেই। সামান্য খাবার বা সাহায্য যা পেতেন, তা নিয়েই চলত তাদের জীবন।
এক ট্র্যাজেডিতে মিলল সন্ধান:

গত সোমবার রাতে মাজার সংলগ্ন দিঘির মহিলা ঘাটে গোসল করতে নেমে কুমিরের আক্রমণের শিকার হয় আট বছরের ফাতেমা। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হলে, সেখানে থাকা ফজিলার ছবি ও পরিচয় দেখে ময়মনসিংহে থাকা তার পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।

সংবাদ পেয়ে ফজিলার মা হাজেরা খাতুন, ভাই হারেছ আলী, ভাই জুয়েল মিয়া এবং ছেলে বজলুর রহমানসহ পরিবারের ছয় সদস্য বাগেরহাটে ছুটে আসেন। মাজারে এসে তারা ফজিলাকে শনাক্ত করেন এবং দীর্ঘদিন পর স্বজনকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
স্বজনদের কণ্ঠে আনন্দ-বেদনার কাব্য:

ফজিলার ছোট ভাই জুয়েল মিয়া বলেন,

“তিন বছর আগে আমার বোন হারিয়ে গিয়েছিল। আজ বোনকে ফিরে পেয়েছি, এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। কিন্তু ভাগ্নি ফাতেমাকে হারানোর কষ্ট কখনো ভুলতে পারব না। বোনকে পেলাম, কিন্তু ভাগ্নিকে হারিয়ে ফেললাম।”

ফজিলার ছেলে বজলুর রহমান বলেন, “তিন বছর ধরে মাকে খুঁজেছি। মাকে ফিরে পেয়েছি, কিন্তু আমার ছোট বোন ফাতেমা আর নেই। মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি, কিন্তু ছোটবোন চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে।”

স্বজনরা জানান, ফজিলা এখনো মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ নন এবং তার মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না। তিনি শুধু বারবার বিড়বিড় করে বলছেন, “আমি আমার মেয়েকে রেখে যাব না।”

খানজাহানের দিঘিতে কুমিরের হামলায় মেয়েকে হারিয়ে ৩ বছর পর পরিবারে ফিরলেন ফজিলা
প্রশাসনের জিম্মায় হস্তান্তর:

বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ফজিলার পরিচয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। পরিবার নিশ্চিত হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে ফজিলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন,

“পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করার পর আমরা পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করি। সমাজসেবা বিভাগ ও পুলিশের উপস্থিতিতে ফজিলা বেগমকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

একদিকে তিন বছর পর হারিয়ে যাওয়া মাকে ফিরে পাওয়ার স্বস্তি, অন্যদিকে ছোট্ট ফাতেমাকে চিরতরে হারানোর গভীর ক্ষত—এই দুই বিপরীত অনুভূতি নিয়েই ময়মনসিংহের নিজ ভিটার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে ফজিলার পরিবার। আর মাজার প্রাঙ্গণে মায়ের আঁচল ধরে ছুটে বেড়ানো সেই ছোট্ট ফাতেমা চিরদিনের জন্য স্মৃতি হয়ে রইল স্থানীয়দের হৃদয়ে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বাগেরহাটে জমি দখল ও হামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

খানজাহানের দিঘিতে কুমিরের হামলায় মেয়েকে হারিয়ে ৩ বছর পর পরিবারে ফিরলেন ফজিলা

আপডেট টাইম : 07:51:07 pm, Thursday, 4 June 2026

বাগেরহাট প্রতিনিধি:একদিকে আট বছরের শিশুকন্যা ফাতেমাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে তিন বছর ধরে নিখোঁজ থাকা এক মাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.) মাজারকে ঘিরে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যেই সামনে এসেছে এমন এক মানবিক গল্প, যা ছুঁয়ে গেছে দেশের মানুষের হৃদয়।

মাজার সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে নিহত শিশু ফাতেমার মা ফজিলা বেগমকে অবশেষে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ তিন বছর ধরে নিখোঁজ থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন ফজিলার খোঁজ মিলেছে মূলত মেয়ের মৃত্যুর মর্মান্তিক সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর।
যেভাবে নিখোঁজ ও মাজারের জীবন:

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরখরিচা গ্রামের বাসিন্দা ফজিলা বেগম প্রায় তিন বছর আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর বহু খোঁজাখুঁজির পরও তার সন্ধান পায়নি পরিবার। একসময় সবাই ধরে নিয়েছিল তিনি আর বেঁচে নেই।

স্থানীয়রা জানান, ফজিলা বেগম প্রায় দুই বছর ধরে খানজাহান আলী (রহ.) মাজার এলাকায় বসবাস করছিলেন। তার সঙ্গে ছিল ছোট মেয়ে ফাতেমা। মাজারের আশপাশে ঘুরে বেড়ানো মা-মেয়ের এই ছোট্ট পৃথিবী ছিল মাজারের খোলা আকাশের নিচেই। সামান্য খাবার বা সাহায্য যা পেতেন, তা নিয়েই চলত তাদের জীবন।
এক ট্র্যাজেডিতে মিলল সন্ধান:

গত সোমবার রাতে মাজার সংলগ্ন দিঘির মহিলা ঘাটে গোসল করতে নেমে কুমিরের আক্রমণের শিকার হয় আট বছরের ফাতেমা। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হলে, সেখানে থাকা ফজিলার ছবি ও পরিচয় দেখে ময়মনসিংহে থাকা তার পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।

সংবাদ পেয়ে ফজিলার মা হাজেরা খাতুন, ভাই হারেছ আলী, ভাই জুয়েল মিয়া এবং ছেলে বজলুর রহমানসহ পরিবারের ছয় সদস্য বাগেরহাটে ছুটে আসেন। মাজারে এসে তারা ফজিলাকে শনাক্ত করেন এবং দীর্ঘদিন পর স্বজনকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
স্বজনদের কণ্ঠে আনন্দ-বেদনার কাব্য:

ফজিলার ছোট ভাই জুয়েল মিয়া বলেন,

“তিন বছর আগে আমার বোন হারিয়ে গিয়েছিল। আজ বোনকে ফিরে পেয়েছি, এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। কিন্তু ভাগ্নি ফাতেমাকে হারানোর কষ্ট কখনো ভুলতে পারব না। বোনকে পেলাম, কিন্তু ভাগ্নিকে হারিয়ে ফেললাম।”

ফজিলার ছেলে বজলুর রহমান বলেন, “তিন বছর ধরে মাকে খুঁজেছি। মাকে ফিরে পেয়েছি, কিন্তু আমার ছোট বোন ফাতেমা আর নেই। মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি, কিন্তু ছোটবোন চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে।”

স্বজনরা জানান, ফজিলা এখনো মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ নন এবং তার মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না। তিনি শুধু বারবার বিড়বিড় করে বলছেন, “আমি আমার মেয়েকে রেখে যাব না।”

খানজাহানের দিঘিতে কুমিরের হামলায় মেয়েকে হারিয়ে ৩ বছর পর পরিবারে ফিরলেন ফজিলা
প্রশাসনের জিম্মায় হস্তান্তর:

বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ফজিলার পরিচয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। পরিবার নিশ্চিত হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে ফজিলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন,

“পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করার পর আমরা পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করি। সমাজসেবা বিভাগ ও পুলিশের উপস্থিতিতে ফজিলা বেগমকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

একদিকে তিন বছর পর হারিয়ে যাওয়া মাকে ফিরে পাওয়ার স্বস্তি, অন্যদিকে ছোট্ট ফাতেমাকে চিরতরে হারানোর গভীর ক্ষত—এই দুই বিপরীত অনুভূতি নিয়েই ময়মনসিংহের নিজ ভিটার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে ফজিলার পরিবার। আর মাজার প্রাঙ্গণে মায়ের আঁচল ধরে ছুটে বেড়ানো সেই ছোট্ট ফাতেমা চিরদিনের জন্য স্মৃতি হয়ে রইল স্থানীয়দের হৃদয়ে।