Dhaka , Thursday, 17 September 2026
শিরোনাম :
বাগেরহাটে বসতবাড়ির তালা ভেঙে মূল্যবান মালামাল ও দলিলপত্র লুটের অভিযোগ বাগেরহাটে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা বাগেরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের মাঝে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ ৪০ কোটি টাকার পানি প্রকল্প অচল, পচা দিঘিতে মাছ শিকারের উৎসব ড্রেন না থাকায় জলাবদ্ধতা, হুমকির মুখে ব্রিজ ঋণের বোঝা, আ.লীগের ‘দায়’ বিএনপির ‘ঘাড়ে’ সমাজবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্তক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর বগুড়ায় প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় আহত নারীর মৃত্যু বাগেরহাটে শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ তানজিন তিশার বিরুদ্ধে মামলার সত্যতা পায়নি পিবিআই, বাদীপক্ষের নারাজি

খানজাহান আলী যেখানে বসে রাজ্য চালাতেন

  • Md.Liton
  • আপডেট টাইম : 07:58:01 pm, Wednesday, 18 May 2022
  • 112 বার

খানজাহান আলীর জন্ম ও পরিচয়

আধুনিককালের ঐতিহাসিক লেনপুলের মতে, ১৮৭১ সালে আগাছার তলদেশ থেকে এই মসজিদ আবিষ্কার করা হয়। শুরুতে জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল মসজিদটি। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে। ৬০০ বছর ধরে নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এই মসজিদ উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম নিদর্শন

মসজিদে ৮১ গম্বুজ

ষাট গম্বুজ মসজিদ নাম দেওয়া হলেও মূলত গম্বুজের সংখ্যা ৮১টি। ষাটটি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় ষাট গম্বুজ মসজিদ নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা ইতিহাসবিদদের। চৌচালা বিশিষ্ট ছাদের ঠিক মাঝখানে পূর্ব-পশ্চিমে সাতটি গম্বুজ। এর এক পাশে সাত সারিতে পাঁচটি করে ৩৫টি। অপর পাশে সাত সারিতে পাঁচটি করে ৩৫টি। চার কোনায় মিনারের ওপর চারটিসহ ৮১টি গম্বুজ রয়েছে। পশ্চিম পাশের দুটি মিনার পূর্বপাশের মিনার দুটি অপেক্ষা মোটা। যার মধ্যে গম্বুজের ওপরে ওঠার জন্য দুটি সিঁড়ি রয়েছে। একটিকে আন্ধারকোঠা বলা হয়। অপরটিকে রওশনকোঠা বলা হয়। একসময় সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আজান দেওয়া হতো। সেই সঙ্গে শত্রুদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হতো। বর্তমানে মাইকে আজান দেওয়া হয়। চারদিকে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা পূর্বপাশে দেয়ালের সঙ্গে যে তোরণ রয়েছে তাকে সিংহদ্বার বলা হয়।মসজিদের পূর্ব দিকে একটি বড় দরজাসহ ১১টি দরজা রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণে ছোটবড় মিলিয়ে ১৪টি দরজা রয়েছে। পশ্চিম দিকে একটি ছোট দরজা রয়েছে। যা দেখে বোঝা যায়, এটি বিচারালয় ছিল। খানজাহান আলী এবং তার শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এখান থেকে মসজিদে যাতায়াত করতেন। সর্বমোট এই মসজিদে ২৬টি দরজা রয়েছে। এটি শুধু মসজিদ নয়; বিচারালয়ও বটে।

মসজিদে বসে ধর্মের দাওয়াত দিতেন এবং সঙ্গী এবং কর্মকর্তাদের নিয়ে সমাবেশ করতেন খানজাহান আলী। মধ্যযুগে বাংলাদেশে অতি প্রাচীন আমলের এত বড় মসজিদ আর কোথাও দেখা যায়নি বলে জানা যায়।

মসজিদের ভেতরে-বাইরে সৌন্দর্যের প্রকৃত রূপ ফুটে উঠেছে

মসজিদের ভেতরে-বাইরে সৌন্দর্যের প্রকৃত রূপ ফুটে উঠেছে

গবেষকরা বলছেন, জলবায়ুর ক্ষতি থেকে মসজিদটি রক্ষায় স্তম্ভের নিচে চার ফুট পর্যন্ত পাথরের আস্তরণ দেওয়া হয়েছে। মসজিদের দুই পাশে সাতটি করে সামনের অংশে ১০টি, মেহেরাবের পাশে একটি দরজা রয়েছে। কারও কারও মতে, ষাটটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে এটিকে ষাট গম্বুজ মসজিদ বলা হয়। মসজিদে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।

ষাট গম্বুজ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আখতারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, ‘ধর্ম প্রচারক হজরত খানজাহান আলী এখানে বড় বড় দিঘি খননের মধ্য দিয়ে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছিলেন। এসব পানি কৃষিকাজে ব্যবহার হতো। সহজ যোগাযোগ ও যাতায়াতের জন্য অনেক রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছেন। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটি তিনি ধর্ম প্রচারের মধ্য দিয়ে শিখিয়ে গেছেন। সামাজিক ও এই অঞ্চলের উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। এখানে বসেই রাজ্য শাসন করতেন তিনি।’

চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘এই মসজিদ নির্মাণ সহজ কাজ ছিল না। তার সঙ্গে এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী ছিলেন। তারাই মূলত তার শক্তি ছিলেন। তিনি যেমন আধ্যাত্মিক ছিলেন, তেমনি ন্যায়পরায়ণ শাসকও। এই অঞ্চলে যেসব স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে, তার মধ্যে সেরা স্থাপনা ষাট গম্বুজ মসজিদ।’

আঠারো শতকের শেষের দিকে অযত্ন ও অবহেলায় মসজিদটি জঙ্গলাকীর্ণ  হয়ে পড়ে। কয়েক দফায় সংস্কার করা হয়। পরে এটি তার পুরনো সৌন্দর্য ফিরে যায়। এখন প্রতিদিন মসজিদ দেখতে ভিড় জমান শত শত দর্শনার্থী।

খানজাহান আলী গবেষক ও সাংবাদিক মো. আরিফুল ইসলাম আকুঞ্জি বলেন, ‘মসজিদের পুরাকীর্তির গায়ে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। এগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব সবার। ঐতিহাসিক এই স্থাপনার কোনও কিছু যাতে হারিয়ে না যায় সেদিকে সবার নজর রাখতে হবে। এটির সৌন্দর্য রক্ষায় পর্যটকদেরও সচেতন হবে হবে।’

বাগেরহাট প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কাস্টোডিয়ান মোহাম্মদ যায়েদ  বলেন, ‘ষাট গম্বুজ মসজিদের পুরাকীর্তির গায়ে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। প্রতিদিন মসজিদটি দেখতে আসেন অসংখ্য পর্যটক। মসজিদের সৌন্দর্য দেখে সবাই মুগ্ধ হন। এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।’

ষাট গম্বুজ মসজিদের খতিব মাওলানা হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘মসজিদের দক্ষিণ পাশের জাদুঘরে ঠাঁই পেয়েছে হজরত খানজাহান আলীর সময়কার শতাধিক নিদর্শন। গত কয়েক বছর ধরে মসজিদে দক্ষিণাঞ্চলের ঈদের সবচেয়ে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই মসজিদ কালের সাক্ষী।’

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বাগেরহাটে বসতবাড়ির তালা ভেঙে মূল্যবান মালামাল ও দলিলপত্র লুটের অভিযোগ

খানজাহান আলী যেখানে বসে রাজ্য চালাতেন

আপডেট টাইম : 07:58:01 pm, Wednesday, 18 May 2022

খানজাহান আলীর জন্ম ও পরিচয়

আধুনিককালের ঐতিহাসিক লেনপুলের মতে, ১৮৭১ সালে আগাছার তলদেশ থেকে এই মসজিদ আবিষ্কার করা হয়। শুরুতে জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল মসজিদটি। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদ একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে। ৬০০ বছর ধরে নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এই মসজিদ উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম নিদর্শন

মসজিদে ৮১ গম্বুজ

ষাট গম্বুজ মসজিদ নাম দেওয়া হলেও মূলত গম্বুজের সংখ্যা ৮১টি। ষাটটি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় ষাট গম্বুজ মসজিদ নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা ইতিহাসবিদদের। চৌচালা বিশিষ্ট ছাদের ঠিক মাঝখানে পূর্ব-পশ্চিমে সাতটি গম্বুজ। এর এক পাশে সাত সারিতে পাঁচটি করে ৩৫টি। অপর পাশে সাত সারিতে পাঁচটি করে ৩৫টি। চার কোনায় মিনারের ওপর চারটিসহ ৮১টি গম্বুজ রয়েছে। পশ্চিম পাশের দুটি মিনার পূর্বপাশের মিনার দুটি অপেক্ষা মোটা। যার মধ্যে গম্বুজের ওপরে ওঠার জন্য দুটি সিঁড়ি রয়েছে। একটিকে আন্ধারকোঠা বলা হয়। অপরটিকে রওশনকোঠা বলা হয়। একসময় সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আজান দেওয়া হতো। সেই সঙ্গে শত্রুদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হতো। বর্তমানে মাইকে আজান দেওয়া হয়। চারদিকে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা পূর্বপাশে দেয়ালের সঙ্গে যে তোরণ রয়েছে তাকে সিংহদ্বার বলা হয়।মসজিদের পূর্ব দিকে একটি বড় দরজাসহ ১১টি দরজা রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণে ছোটবড় মিলিয়ে ১৪টি দরজা রয়েছে। পশ্চিম দিকে একটি ছোট দরজা রয়েছে। যা দেখে বোঝা যায়, এটি বিচারালয় ছিল। খানজাহান আলী এবং তার শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এখান থেকে মসজিদে যাতায়াত করতেন। সর্বমোট এই মসজিদে ২৬টি দরজা রয়েছে। এটি শুধু মসজিদ নয়; বিচারালয়ও বটে।

মসজিদে বসে ধর্মের দাওয়াত দিতেন এবং সঙ্গী এবং কর্মকর্তাদের নিয়ে সমাবেশ করতেন খানজাহান আলী। মধ্যযুগে বাংলাদেশে অতি প্রাচীন আমলের এত বড় মসজিদ আর কোথাও দেখা যায়নি বলে জানা যায়।

মসজিদের ভেতরে-বাইরে সৌন্দর্যের প্রকৃত রূপ ফুটে উঠেছে

মসজিদের ভেতরে-বাইরে সৌন্দর্যের প্রকৃত রূপ ফুটে উঠেছে

গবেষকরা বলছেন, জলবায়ুর ক্ষতি থেকে মসজিদটি রক্ষায় স্তম্ভের নিচে চার ফুট পর্যন্ত পাথরের আস্তরণ দেওয়া হয়েছে। মসজিদের দুই পাশে সাতটি করে সামনের অংশে ১০টি, মেহেরাবের পাশে একটি দরজা রয়েছে। কারও কারও মতে, ষাটটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে এটিকে ষাট গম্বুজ মসজিদ বলা হয়। মসজিদে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।

ষাট গম্বুজ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আখতারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, ‘ধর্ম প্রচারক হজরত খানজাহান আলী এখানে বড় বড় দিঘি খননের মধ্য দিয়ে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছিলেন। এসব পানি কৃষিকাজে ব্যবহার হতো। সহজ যোগাযোগ ও যাতায়াতের জন্য অনেক রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছেন। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটি তিনি ধর্ম প্রচারের মধ্য দিয়ে শিখিয়ে গেছেন। সামাজিক ও এই অঞ্চলের উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। এখানে বসেই রাজ্য শাসন করতেন তিনি।’

চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘এই মসজিদ নির্মাণ সহজ কাজ ছিল না। তার সঙ্গে এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী ছিলেন। তারাই মূলত তার শক্তি ছিলেন। তিনি যেমন আধ্যাত্মিক ছিলেন, তেমনি ন্যায়পরায়ণ শাসকও। এই অঞ্চলে যেসব স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে, তার মধ্যে সেরা স্থাপনা ষাট গম্বুজ মসজিদ।’

আঠারো শতকের শেষের দিকে অযত্ন ও অবহেলায় মসজিদটি জঙ্গলাকীর্ণ  হয়ে পড়ে। কয়েক দফায় সংস্কার করা হয়। পরে এটি তার পুরনো সৌন্দর্য ফিরে যায়। এখন প্রতিদিন মসজিদ দেখতে ভিড় জমান শত শত দর্শনার্থী।

খানজাহান আলী গবেষক ও সাংবাদিক মো. আরিফুল ইসলাম আকুঞ্জি বলেন, ‘মসজিদের পুরাকীর্তির গায়ে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। এগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব সবার। ঐতিহাসিক এই স্থাপনার কোনও কিছু যাতে হারিয়ে না যায় সেদিকে সবার নজর রাখতে হবে। এটির সৌন্দর্য রক্ষায় পর্যটকদেরও সচেতন হবে হবে।’

বাগেরহাট প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের কাস্টোডিয়ান মোহাম্মদ যায়েদ  বলেন, ‘ষাট গম্বুজ মসজিদের পুরাকীর্তির গায়ে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। প্রতিদিন মসজিদটি দেখতে আসেন অসংখ্য পর্যটক। মসজিদের সৌন্দর্য দেখে সবাই মুগ্ধ হন। এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।’

ষাট গম্বুজ মসজিদের খতিব মাওলানা হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘মসজিদের দক্ষিণ পাশের জাদুঘরে ঠাঁই পেয়েছে হজরত খানজাহান আলীর সময়কার শতাধিক নিদর্শন। গত কয়েক বছর ধরে মসজিদে দক্ষিণাঞ্চলের ঈদের সবচেয়ে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই মসজিদ কালের সাক্ষী।’