Dhaka , Thursday, 17 September 2026
শিরোনাম :
বাগেরহাটে বসতবাড়ির তালা ভেঙে মূল্যবান মালামাল ও দলিলপত্র লুটের অভিযোগ বাগেরহাটে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা বাগেরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের মাঝে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ ৪০ কোটি টাকার পানি প্রকল্প অচল, পচা দিঘিতে মাছ শিকারের উৎসব ড্রেন না থাকায় জলাবদ্ধতা, হুমকির মুখে ব্রিজ ঋণের বোঝা, আ.লীগের ‘দায়’ বিএনপির ‘ঘাড়ে’ সমাজবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্তক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর বগুড়ায় প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় আহত নারীর মৃত্যু বাগেরহাটে শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ তানজিন তিশার বিরুদ্ধে মামলার সত্যতা পায়নি পিবিআই, বাদীপক্ষের নারাজি

বাগেরহাটে দুর্ঘটনা: ‘সন্তানদের নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব’

  • Md.Liton
  • আপডেট টাইম : 02:55:06 pm, Monday, 2 May 2022
  • 122 বার

বাগেরহাট সংবাদদাতা: ঈদের মাত্র ১দিন বাকি। ৫ দিন আগে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন ট্রাকচালক জালাল হাওলাদার। সন্তানদের কথা দিয়ে গেছেন রোববার ফিরে এসে মার্কেটে নিয়ে যাবেন। নতুন জামা-প্যান্ট কিনে দেবেন দুই সন্তানকে। সে জন্য নিজের ব্যবহৃত মোবাইলটিও বিক্রি করে দিয়েছেন ৩ হাজার টাকায়। রোববার সন্ধ্যায় বাড়িতে ফেরার কথা থাকলেও সময়ের বেশ খানিকটা আগেই বাড়িতে ফিরেছেন জালাল। তবে জীবিত নয়, মৃত অবস্থায়। রোববার সকালে বাগেরহাটের ফকিরহাটে বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহতের মধ্যে একজন বাগেরহাট শহরের খারদ্বার এলাকার রুস্তম হাওলাদারের ছেলে ট্রাকচালক জালাল হাওলাদার (৩৫)। রোববার দুপুরে মরদেহ শহরের আলিয়া মাদরাসা সড়ক সংলগ্ন ভাড়া বাড়িতে পৌঁছালে শোকের মাতম উঠে সেখানে। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ।

নিহতের স্ত্রী পলি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেদের নিয়ে আমার স্বামীর অনেক স্বপ্ন ছিল। সবসময় বলত ওদের আমার মতো কষ্ট করতে দেব না। পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করব। ৫ দিন আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও আমারে বলে গেছে ছেলেদের তুমি দেখে রাইখ। ওদের গায়ে যেন হাত দিও না। ঈদে অনেক খরচ। আমি একবারে টাকাপয়সা জোগাড় করে বাড়ি ফেরব।’ ‘গেল রাতেও সেহেরিতে আমারে ফোন দিয়ে ডাইকে দিছে। বলিছে আমি সন্ধ্যার (রোববার) মধ্যে বাড়ি চলে আসবানি। ছেলেদের জামা-কাপড় কিনে দেওয়ার জন্য বড় মোবাইলও তিন হাজার টাকায় বেইচে দিছে। কিন্তু এ আমাদের কী সর্বনাশ হয়ে গেল! এখন আমি নাবালক দুইটা বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব, ওদের কী খাওয়াব, বাড়ির ভাড়াই বা কীভাবে দেব। আমার তো সব শেষ হয়ে গেল।’ যোগ করেন তিনি।

নিহতের বড় ছেলে দশ বছর বয়সী রবিউল হাওলাদার বলেন, ‘বাবা যাওয়ার আগে আমারে আর ভাইরে বলে গেছে ঈদে সুন্দর সুন্দর জামা কিনে দিবে। অনেক খাবার কিনবে আমাদের নিয়ে। ঈদের দিন সেই সব খাব। কিন্তু আব্বু তো এখন কথাই বলে না। আল্লাহর কাছে চলে গেছে। কে দেবেনে ওইসব কিনে। ঘাড়ে করে নিয়েই বা কে যে ঘোরবেনে আমাদের দুই ভাইরে।’

নিহতের মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘আমার তিন ছেলের মধ্যে জালাল মেজো। সব সময় যাওয়ার আগে আমারে ডাক দিয়ে বলে যায় মা আমি গেলাম। এবারও যাওয়ার আগে আমার হাতে ত্রিশ টাকা দিয়ে বলে মা কাজের তে আইসে তোমারে বেশি টাকা দেব, এখন টাকা নেই। আমি তো টাকা চাই না, আমি আমার ছেলে চাই। আল্লাহ এই ঈদের আগে আমাদের এত বড় ক্ষতি হয়ে গেল। ছোট ছোট দুটো পোতা, (জালালের দুই ছেলে) ওদের কে দেখবে এখন।’

এদিকে জালাল হাওলাদারের মৃত্যুর খবরে রোববার বিকেলে তার বাড়িতে যেয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন বাগেরহাট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার নাছির উদ্দিন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুছাব্বেরুল ইসলাম, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া পারভীন, বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার আব্দুল বাকীসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুছাব্বেরুল ইসলাম পরিবারটির এ ক্ষতি অপূরণীয়। তারপরেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা এবং কিছু খাদ্যসামগ্রী উপহার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরবর্তীতেও অসহায় পরিবারটিকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।

প্রসঙ্গত, ফকিরহাটে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে শিশুসহ তিনজন নিহত হয়েছে। রোববার সকালে খুলনা-মাওয়া মহাসড়কের উপজেলার পালেরহাট এলাকায় এই দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হন। পরে আহতদের বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। নিহতরা হলেন টাঙ্গাইল জেলার মাসুদ শেখের ছেলে ১০ মাস বয়সী আয়াস শেখ, বাগেরহাট শহরের খারদ্বার এলাকার রুস্তম হাওলাদারের ছেলে ট্রাকচালক জালাল হাওলাদার (৩৫) এবং ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার শুকুর আলীর ছেলে বাসচালক আব্দুল্লাহ (৪০)।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বাগেরহাটে বসতবাড়ির তালা ভেঙে মূল্যবান মালামাল ও দলিলপত্র লুটের অভিযোগ

বাগেরহাটে দুর্ঘটনা: ‘সন্তানদের নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব’

আপডেট টাইম : 02:55:06 pm, Monday, 2 May 2022

বাগেরহাট সংবাদদাতা: ঈদের মাত্র ১দিন বাকি। ৫ দিন আগে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন ট্রাকচালক জালাল হাওলাদার। সন্তানদের কথা দিয়ে গেছেন রোববার ফিরে এসে মার্কেটে নিয়ে যাবেন। নতুন জামা-প্যান্ট কিনে দেবেন দুই সন্তানকে। সে জন্য নিজের ব্যবহৃত মোবাইলটিও বিক্রি করে দিয়েছেন ৩ হাজার টাকায়। রোববার সন্ধ্যায় বাড়িতে ফেরার কথা থাকলেও সময়ের বেশ খানিকটা আগেই বাড়িতে ফিরেছেন জালাল। তবে জীবিত নয়, মৃত অবস্থায়। রোববার সকালে বাগেরহাটের ফকিরহাটে বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহতের মধ্যে একজন বাগেরহাট শহরের খারদ্বার এলাকার রুস্তম হাওলাদারের ছেলে ট্রাকচালক জালাল হাওলাদার (৩৫)। রোববার দুপুরে মরদেহ শহরের আলিয়া মাদরাসা সড়ক সংলগ্ন ভাড়া বাড়িতে পৌঁছালে শোকের মাতম উঠে সেখানে। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ।

নিহতের স্ত্রী পলি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেদের নিয়ে আমার স্বামীর অনেক স্বপ্ন ছিল। সবসময় বলত ওদের আমার মতো কষ্ট করতে দেব না। পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করব। ৫ দিন আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও আমারে বলে গেছে ছেলেদের তুমি দেখে রাইখ। ওদের গায়ে যেন হাত দিও না। ঈদে অনেক খরচ। আমি একবারে টাকাপয়সা জোগাড় করে বাড়ি ফেরব।’ ‘গেল রাতেও সেহেরিতে আমারে ফোন দিয়ে ডাইকে দিছে। বলিছে আমি সন্ধ্যার (রোববার) মধ্যে বাড়ি চলে আসবানি। ছেলেদের জামা-কাপড় কিনে দেওয়ার জন্য বড় মোবাইলও তিন হাজার টাকায় বেইচে দিছে। কিন্তু এ আমাদের কী সর্বনাশ হয়ে গেল! এখন আমি নাবালক দুইটা বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাব, ওদের কী খাওয়াব, বাড়ির ভাড়াই বা কীভাবে দেব। আমার তো সব শেষ হয়ে গেল।’ যোগ করেন তিনি।

নিহতের বড় ছেলে দশ বছর বয়সী রবিউল হাওলাদার বলেন, ‘বাবা যাওয়ার আগে আমারে আর ভাইরে বলে গেছে ঈদে সুন্দর সুন্দর জামা কিনে দিবে। অনেক খাবার কিনবে আমাদের নিয়ে। ঈদের দিন সেই সব খাব। কিন্তু আব্বু তো এখন কথাই বলে না। আল্লাহর কাছে চলে গেছে। কে দেবেনে ওইসব কিনে। ঘাড়ে করে নিয়েই বা কে যে ঘোরবেনে আমাদের দুই ভাইরে।’

নিহতের মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘আমার তিন ছেলের মধ্যে জালাল মেজো। সব সময় যাওয়ার আগে আমারে ডাক দিয়ে বলে যায় মা আমি গেলাম। এবারও যাওয়ার আগে আমার হাতে ত্রিশ টাকা দিয়ে বলে মা কাজের তে আইসে তোমারে বেশি টাকা দেব, এখন টাকা নেই। আমি তো টাকা চাই না, আমি আমার ছেলে চাই। আল্লাহ এই ঈদের আগে আমাদের এত বড় ক্ষতি হয়ে গেল। ছোট ছোট দুটো পোতা, (জালালের দুই ছেলে) ওদের কে দেখবে এখন।’

এদিকে জালাল হাওলাদারের মৃত্যুর খবরে রোববার বিকেলে তার বাড়িতে যেয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন বাগেরহাট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সরদার নাছির উদ্দিন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুছাব্বেরুল ইসলাম, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া পারভীন, বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার আব্দুল বাকীসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুছাব্বেরুল ইসলাম পরিবারটির এ ক্ষতি অপূরণীয়। তারপরেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা এবং কিছু খাদ্যসামগ্রী উপহার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরবর্তীতেও অসহায় পরিবারটিকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।

প্রসঙ্গত, ফকিরহাটে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে শিশুসহ তিনজন নিহত হয়েছে। রোববার সকালে খুলনা-মাওয়া মহাসড়কের উপজেলার পালেরহাট এলাকায় এই দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হন। পরে আহতদের বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। নিহতরা হলেন টাঙ্গাইল জেলার মাসুদ শেখের ছেলে ১০ মাস বয়সী আয়াস শেখ, বাগেরহাট শহরের খারদ্বার এলাকার রুস্তম হাওলাদারের ছেলে ট্রাকচালক জালাল হাওলাদার (৩৫) এবং ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার শুকুর আলীর ছেলে বাসচালক আব্দুল্লাহ (৪০)।