Dhaka , Thursday, 17 September 2026
শিরোনাম :
বাগেরহাটে বসতবাড়ির তালা ভেঙে মূল্যবান মালামাল ও দলিলপত্র লুটের অভিযোগ বাগেরহাটে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা বাগেরহাটে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারের মাঝে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ ৪০ কোটি টাকার পানি প্রকল্প অচল, পচা দিঘিতে মাছ শিকারের উৎসব ড্রেন না থাকায় জলাবদ্ধতা, হুমকির মুখে ব্রিজ ঋণের বোঝা, আ.লীগের ‘দায়’ বিএনপির ‘ঘাড়ে’ সমাজবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্তক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর বগুড়ায় প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় আহত নারীর মৃত্যু বাগেরহাটে শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ তানজিন তিশার বিরুদ্ধে মামলার সত্যতা পায়নি পিবিআই, বাদীপক্ষের নারাজি
আমাদের হাসান

যে শখ খুলনার সম্পদ হতে পারে

  • Md.Liton
  • আপডেট টাইম : 10:12:02 pm, Tuesday, 7 July 2026
  • 304 বার

নাসির আহমেদ।

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের সমষ্টি হচ্ছে জীবন। আর জীবনের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে প্রতিটি মুহূর্তের অভিজ্ঞতা। তাকে সর্ব পরিস্হতিতে পরিবেশের ওপর খাপ খাইয়ে চলতে হয়।এখানে সুখ-দুঃখ পাশাপাশি অবস্থান করে।কেউ কেউ বলেন,জীবনের বংশবৃদ্ধি হয় প্রকৃতিগত কারণে বিধায় জীবনের উদ্দেশ্য হলো,সুখী হওয়া এবং আনন্দ খুঁজে পাওয়া।
আমি যখন এই লেখা লিখতে বসেছি, তখন একটা গানের কলি মনে পড়েছে, প্রয়াত শিল্পী লাকি আকন্দ গানটা গেয়েছেন, ” এই নীল মণি হার/এই স্বর্ণালী বিকেল/ তোমায় দিয়ে গেলাম/শুধু মনে রেখ….
নীলমণি হারটা কোনো প্রেয়সীর শখের হতে পারে কিংবা কাংখিত বিকেলটা প্রেমিক মনের কাছে যথেষ্ট আবেদনময় হতে পারে!অর্থাৎ, শখের বিষয়াবলী।

বস্তজগতে শখ পূরণ করতে গেলেই অর্থ ব্যয় করতে হয়।যার শখ যত বেশি তার ব্যয়ও তত বেশি।যারা নিজের ভালো লাগার কাজগুলোতে ডুবে থাকেন তারা খুঁজে পায় শান্তি। প্রেরণা আর নতুন উদ্যম। আসুন, একটু মনোজ তত্ত্বের ভিতরে ঢুকে পড়ি।
সাধারণত শখ পাগল মানুষের মধ্যে যত্ন,মমতা আর রঙিন স্বপ্নগুলো লুকিয়ে থাকে।তাদের ঐশ্বরিকভাবে শান্ত শক্তি থাকে,যা তাকে স্হির থাকতে শেখায় এবং ভালোবাসা আরও গভীর করে তোলে।শখ কখনোই সস্তা হতে পারে না।মানুষের জীবনে শখের প্রয়োজনীয়তাও কখনো ফুরোয় না।শখের জিনিস বলতে শুধুমাত্র বস্তু নয় ভ্রমণও সখের মধ্যে গণ্য।

কথায় কথায় বলতে শুনেছি, শখের তোলা আশি টাকা।পরিমাপের ‘তোলা’ – কে একপাশে ঠেলে লক্ষ্য করবেন,শখ পূরণে মানুষ নিঃস্ব হয়েছে এমন নজির,কাহিনি চাক্ষুষ বা গ্রন্থপাতায় পাবেন।আমাদের আজকের শিরোনামের আলোচ্য ব্যক্তি এম এম হাসান।ডাকনাম সোহেল। হাসান নামেই তিনি অধিক পরিচিত। পিতার নাম এ বি মিয়া আব্দুস শুকুর।মাতা মমতাজ শুকুর।পিতা চাকুরী করতেন জি পি ও – তে। তিনি অবসর গ্রহণের পর জর্জ কোর্টে ওকালতি করতেন।

এম এম হাসানের শুরুর শখটা ডাক টিকিট সংগ্রহ হতে পেয়ে বসেছিল।উৎসাহ-প্রেরণায় তার পিতার অবদান অনস্বীকার্য।ডাক টিকিট সংগ্রহ করাকালীন অনেক খন্ড খন্ড অতীত স্মৃতি রয়েছে। একদিনের কথা…

রেলওয়ে মাঠে ফুটবল খেলে বাড়ি ফিরছি, এমন সময় পাওয়ার হাউজ মোড়ে এক অপরিচিত লোকের হাতে একটা খাম দেখতে পাচ্ছি তখন,উনার পিছু নিই।এইচ আর এইচ প্রিন্স আগাখান স্কুলের কাছাকাছি এলে লোকটা বলে,আমার পিছনে পিছনে এতটা পথ এলে,
বিষয় কি? (হাসান বললো) আপনার হাতের খামে যে ডাকটিকিট লাগানো আছে সেটা প্রয়োজন।
: তুমি ডাকটিকিট সংগ্রহ কর!
: হ্যাঁ।
: খাম থেকে ডাকটিকিট খুলে দিলেন, সেই ভদ্রলোক।
সাক্ষাৎকার নিতে গেলে এম এম হাসানের একটা কথা আমার ভিষণ ভালো লেগেছে। আমরা যারা মনে করি,টাকা ছাড়া শখ পূরণ সম্ভব নয়,আসলে আমাদের ধারণায় ভুলের বসতি।মানুষের প্রতি ভালোবাসা-
সম্মান, ধৈর্যধারণ করলে কাংখিত স্বপ্নের জায়গায় চলে যাওয়া সম্ভব। কেউ তাকে ঠেকাতে পারবে না। প্রায় দেড়শো দেশের ডাকটিকিট হাসানের সংগ্রহে আছে।

যে শখ খুলনার  সম্পদ হতে পারে

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ১৬ ডিসেম্বর’২০২৩ ও ২০২৪ সালে সনদপত্র ও সম্মানসূচক ক্রেস্ট দিয়ে সম্মানিত করেছে।ডাকটিকিটের পাশাপাশি এখন শখের সংগ্রহের পরিধিতে ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে এম এম হাসানের। স্বচোখে না দেখলে বোঝাতে পারাটা কঠিন। আমি স্বচোখে দেখে রীতিমতো অবাক!

ইংরেজিতে Collector অর্থাৎ, যিনি সংগ্রহ করেন,
আহরণকারী বা সঞ্চয়কারী।যদি কেউ কিছু একত্রিত করে বা জোগাড় করে ঐতিহ্য লালন করেন তিনি ইতিহাস- কে মানুষের কাছে নিয়ে আসার মহৎকর্মটিই করলেন। এটাকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। প্রাসঙ্গিকতায় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু, এড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।তা হলো,এম এম হাসানের সহধর্মিণী মুর্শিদা ফেরদৌস।যার ঐকান্তিক সহযোগিতা ও পরিচর্যায় আজকের এম এম হাসানের শৈশব শখ জগতে এতটুকুন ক্ষতি সাধন হয়নি বরং, আরও বৃহৎ আকারে করা যাওয়া সম্ভব হয়েছে।তাদের সংসারে দুই কন্যা সন্তান। লায়লাতুল হাসানা ( রোজা) ও জান্নাতুল হাতাসিনা ( রুপু)। লায়লাতুল হাসানা এবার এস এস সি পরীক্ষার্থী।
এম এম হাসানের আরও কিছু গুণাবলি রয়েছে, সেগুলোতে পরে আসছি।তার সংগ্রহ শালার জন্য আমাদের করণীয় প্রভৃতির কথায় যাওয়ার আগে ; সুপ্রিয় পাঠক-আপনাদের নিয়ে যেতে চাই

তার সংগ্রহশালায়।চলুন…

ঘরে ঢুকতেই নজরে এলো অনেক অনেক বই।যা শোবার স্হানে মাথা,পা,ডানে-বামে কোনোরকম থরে থরে সাজানো আছে। বই দিয়ে দেখা শুরু।পরতে পরতে অনেক গুছিয়ে বলার চেষ্টা করলে লেখার কলরব বেড়ে যাবে। ডাকঘর – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর বইটা প্রথম সংস্করণ ছাপা হয়, ১৩১৮ বাংলা সনে। হাসান দেখাতেই মোবাইলে স্ন্যাপ নিয়ে নিলাম। আরও কিছু স্ন্যাপ নিয়ে ছিলাম, সেগুলো পোস্টে সংযুক্ত করে দিয়েছি। একে একে কতিপয় জিনিস নিয়ে বলতে থাকি আশা করছি, সঙ্গে থাকবেন।

১৯৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীনঅস্ত্রের (জোগান দিতে)চেয়ে হাতের লেখা, ১৯৫৫ সালের সরকারি ছুটির তালিকা, পিতার সার্টিফিকেট (১৯৬১),বহু পুরাতন পোস্টাল অর্ডার,১২৭০ সালের দলিল,রূপালী ব্যাংকের স্লিপ, পুরাতন বিয়ারিং চিঠি, দাদার ছবি,১৯৫১ সালের ক্যালেন্ডার, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দিন বাজার থেকে ফিরে একজন ডাইরি লেখকের লেখা ডাইরি, বাংলাদেশের বিভিন্ন দিয়াশলাই, অসংখ্য দেশের কয়েন-টাকা,কার্ড,স্ট্যাম্প, সিনেমা রিল ফ্লিম,সাদাকালো ছবি- নেগেটিভ , ডিভিডি ফ্লিম,টর্চ লাইট, সবচেয়ে বড় খবর- ঢাকাইয়া মুসলিন কাপড়ের একটা হাসানের সংগ্রহশালায় রয়েছে।

আপনারা যারা খুলনা মহানগরীতে বসবাস করছেন, তাদের কাছে পিকচার প্যালেসের( সিনেমা হল) কথা অজানা নয়।এই পিকচার প্যালেসে একসময় শিশুদের জন্য আর্থিক সাহায্যের অনুদান সংগ্রহ করতে; সিনেমার টিকিটের সঙ্গে বাড়তি একটা টিকিট বিক্রি করে তহবিল সংগ্রহ করতো,সেই টিকিটও সংগ্রহ-শালায় রয়েছে।একাত্তরের চিঠি নামক একটা গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে এই গ্রন্থে একটা চিঠি ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়েছে। চিঠিটা ‘বুলা’ নামক এক মেয়ের লেখা। এই চিঠির আসল একটা কপি হাসানের সংগ্রহ আছে।তার মনে স্বাভাবিকভাবে উদয় হয়েছে, এটা পুরনো কাগজের দোকান থেকে সে সংগ্রহ করেছিলো তাহলে,প্রথম আলো যে কপিটি তুলে ধরেছে,এটা কোথা হতে কেমন করে এলো? বিষয়টা অতীব গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছেও মনে হয়েছে।যদি কেউ আগ্রহী হয়, তাহলে নিশ্চয়ই মূল তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ডের স্ট্যাম্প এ্যালবাম, রয়েছে এক হস্ত বিশিষ্ট দালানের ইট।যুদ্ধাপরাধী মাওলানা ইউসুফের স্বহস্তে লেখা একটা বইয়ে লেখা দু’কলম কথার সাথে স্বাক্ষরিত সহি।উল্লেখ্য, হাসানের শশুর বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের অধিবাসী। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।তার সাদাকালো ছবিটা দেখলে মনেই হবেনা যে এটা সদ্য তোলা নয়।

রোজ শনিবার, ২৮ জানুয়ারি’ ২০২৩, মাঘ’ ১৪ বাংলা’১৪২৯ – এ “প্রথম আলো”খুলনা কালেক্টরস শো” নামের প্রদর্শনী নিয়ে ‘ আছে বিরল নোট,মসলিনও’ শিরোনামে একটা প্রতিবেদন ছেপেছিল।সেখানে উল্লেখ করেছে ৩১ জন সংগ্রাহক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য (তৎকালীন)মাহমুদ হোসেন এই প্রদশর্নীর উদ্বোধন করেন।প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে প্রদর্শনী। অবশ্য, সেই লেখাতে প্রতিবেদক আলাদাভাবে খুলনাকে প্রাধান্য করেননি। সে সুযোগ হয়তো, কম রয়েছে কিন্তু, আমরা কেন অনলাইনে বা অফলাইনে বিভিন্ন আঙ্গিকে খুলনাকে তুলে আনতে পারবোনা। বলতে পারেন,সেই লক্ষ্যেই আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস।আপনারও যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসার আহবান রাখছি।

এই লেখার পূর্বে বলে এসেছি, এম এম হাসানের অন্যান্য কিছু গুণ রয়েছে, তিনি লেখালেখি করেন,করেন নাটক, সংগীত নিজে না করলেও একজন সংগীত প্রিয় মানুষ। তাই তাকে,খুলনা নাট্য নিকেতন (স্হাপিত- ১৯০০),মির্জাপুর যুব সংঘ ( ১৯৫৮),খুলনা সাহিত্য পরিষদ (১৯৬৩),জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ (১৯৮০),খুলনা,ফটোগ্রাফিক সোসাইটি ( ১৯৮৯), অগ্রদূত মুক্ত দল ( কাপ ও স্কাউট), খুলনা কালেক্টর সোসাইটি, গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষা মঞ্চ, খুলনার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। বেতার বাংলাদেশ খুলনাতেও নাটকে অভিনয় করেছেন, হাসান।

পরিশেষে, স্পষ্ট করে বলে রাখা উচিত, এই শহরে (প্বার্শবর্তী উপজেলা থেকে আগত) প্রায় আঠারো লক্ষ মানুষের বসবাস।এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুকুমার বৃত্তি চর্চার লোকসংখ্যা আর কতোই বা হবে। তাদের জন্য সুন্দর একটা প্ল্যাটফর্ম যদি সৃষ্টি না করা যায় তাহলে, আমাদের ঐতিহ্যকে আমরা নিজেরাই হত্যা করার অপরাধে অপরাধী হবো।মনে রাখতে হবে শিল্পচর্চা একটা জাতির মেরুকরণের সাথে সম্পৃক্ত।বাংলাদেশের রয়েছে,গৌরদীপ্ত ইতিহাস।সেই ইতিহাসের ধারক বাহক হয়ে স্বযতনে আমাদের -কে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে,তা-ই না!কাজেই, আমি ব্যক্তিগত অভিমত দিতে চাই,প্রদর্শনীর আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার নিবন্ধন ফি (বিগত দিনে) ৩৫০০ ছিলো, এটাকে কমানোর দরকার।

খুলনার সংগ্রহকদের তালিকায় থাকা বিভিন্ন উপাদানগুলো যাতে বিনষ্ট না হয়, সেজন্য অনুদান এবং স্থান দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।তাদের মর্যাদা রক্ষা করে সরকারিভাবে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা দরকার। আমি,কখনোই কাউকে আহত করে কিংবা অধিক আগ্রহী হয়ে অতিরিক্ত কিছু বলার পক্ষে নই।আশাবাদী, এই লেখার মধ্য আপনারা যে এম এম হাসানের তথ্য পেলেন,তাকে নিশ্চয়ই উৎসাহ জুগিয়ে আগামীর পথ প্রসস্থ করবেন।

সকলের সার্বিক কল্যাণ কামনা রাখছি।
নাসির আহমেদ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বাগেরহাটে বসতবাড়ির তালা ভেঙে মূল্যবান মালামাল ও দলিলপত্র লুটের অভিযোগ

আমাদের হাসান

যে শখ খুলনার সম্পদ হতে পারে

আপডেট টাইম : 10:12:02 pm, Tuesday, 7 July 2026

নাসির আহমেদ।

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের সমষ্টি হচ্ছে জীবন। আর জীবনের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে প্রতিটি মুহূর্তের অভিজ্ঞতা। তাকে সর্ব পরিস্হতিতে পরিবেশের ওপর খাপ খাইয়ে চলতে হয়।এখানে সুখ-দুঃখ পাশাপাশি অবস্থান করে।কেউ কেউ বলেন,জীবনের বংশবৃদ্ধি হয় প্রকৃতিগত কারণে বিধায় জীবনের উদ্দেশ্য হলো,সুখী হওয়া এবং আনন্দ খুঁজে পাওয়া।
আমি যখন এই লেখা লিখতে বসেছি, তখন একটা গানের কলি মনে পড়েছে, প্রয়াত শিল্পী লাকি আকন্দ গানটা গেয়েছেন, ” এই নীল মণি হার/এই স্বর্ণালী বিকেল/ তোমায় দিয়ে গেলাম/শুধু মনে রেখ….
নীলমণি হারটা কোনো প্রেয়সীর শখের হতে পারে কিংবা কাংখিত বিকেলটা প্রেমিক মনের কাছে যথেষ্ট আবেদনময় হতে পারে!অর্থাৎ, শখের বিষয়াবলী।

বস্তজগতে শখ পূরণ করতে গেলেই অর্থ ব্যয় করতে হয়।যার শখ যত বেশি তার ব্যয়ও তত বেশি।যারা নিজের ভালো লাগার কাজগুলোতে ডুবে থাকেন তারা খুঁজে পায় শান্তি। প্রেরণা আর নতুন উদ্যম। আসুন, একটু মনোজ তত্ত্বের ভিতরে ঢুকে পড়ি।
সাধারণত শখ পাগল মানুষের মধ্যে যত্ন,মমতা আর রঙিন স্বপ্নগুলো লুকিয়ে থাকে।তাদের ঐশ্বরিকভাবে শান্ত শক্তি থাকে,যা তাকে স্হির থাকতে শেখায় এবং ভালোবাসা আরও গভীর করে তোলে।শখ কখনোই সস্তা হতে পারে না।মানুষের জীবনে শখের প্রয়োজনীয়তাও কখনো ফুরোয় না।শখের জিনিস বলতে শুধুমাত্র বস্তু নয় ভ্রমণও সখের মধ্যে গণ্য।

কথায় কথায় বলতে শুনেছি, শখের তোলা আশি টাকা।পরিমাপের ‘তোলা’ – কে একপাশে ঠেলে লক্ষ্য করবেন,শখ পূরণে মানুষ নিঃস্ব হয়েছে এমন নজির,কাহিনি চাক্ষুষ বা গ্রন্থপাতায় পাবেন।আমাদের আজকের শিরোনামের আলোচ্য ব্যক্তি এম এম হাসান।ডাকনাম সোহেল। হাসান নামেই তিনি অধিক পরিচিত। পিতার নাম এ বি মিয়া আব্দুস শুকুর।মাতা মমতাজ শুকুর।পিতা চাকুরী করতেন জি পি ও – তে। তিনি অবসর গ্রহণের পর জর্জ কোর্টে ওকালতি করতেন।

এম এম হাসানের শুরুর শখটা ডাক টিকিট সংগ্রহ হতে পেয়ে বসেছিল।উৎসাহ-প্রেরণায় তার পিতার অবদান অনস্বীকার্য।ডাক টিকিট সংগ্রহ করাকালীন অনেক খন্ড খন্ড অতীত স্মৃতি রয়েছে। একদিনের কথা…

রেলওয়ে মাঠে ফুটবল খেলে বাড়ি ফিরছি, এমন সময় পাওয়ার হাউজ মোড়ে এক অপরিচিত লোকের হাতে একটা খাম দেখতে পাচ্ছি তখন,উনার পিছু নিই।এইচ আর এইচ প্রিন্স আগাখান স্কুলের কাছাকাছি এলে লোকটা বলে,আমার পিছনে পিছনে এতটা পথ এলে,
বিষয় কি? (হাসান বললো) আপনার হাতের খামে যে ডাকটিকিট লাগানো আছে সেটা প্রয়োজন।
: তুমি ডাকটিকিট সংগ্রহ কর!
: হ্যাঁ।
: খাম থেকে ডাকটিকিট খুলে দিলেন, সেই ভদ্রলোক।
সাক্ষাৎকার নিতে গেলে এম এম হাসানের একটা কথা আমার ভিষণ ভালো লেগেছে। আমরা যারা মনে করি,টাকা ছাড়া শখ পূরণ সম্ভব নয়,আসলে আমাদের ধারণায় ভুলের বসতি।মানুষের প্রতি ভালোবাসা-
সম্মান, ধৈর্যধারণ করলে কাংখিত স্বপ্নের জায়গায় চলে যাওয়া সম্ভব। কেউ তাকে ঠেকাতে পারবে না। প্রায় দেড়শো দেশের ডাকটিকিট হাসানের সংগ্রহে আছে।

যে শখ খুলনার  সম্পদ হতে পারে

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ১৬ ডিসেম্বর’২০২৩ ও ২০২৪ সালে সনদপত্র ও সম্মানসূচক ক্রেস্ট দিয়ে সম্মানিত করেছে।ডাকটিকিটের পাশাপাশি এখন শখের সংগ্রহের পরিধিতে ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে এম এম হাসানের। স্বচোখে না দেখলে বোঝাতে পারাটা কঠিন। আমি স্বচোখে দেখে রীতিমতো অবাক!

ইংরেজিতে Collector অর্থাৎ, যিনি সংগ্রহ করেন,
আহরণকারী বা সঞ্চয়কারী।যদি কেউ কিছু একত্রিত করে বা জোগাড় করে ঐতিহ্য লালন করেন তিনি ইতিহাস- কে মানুষের কাছে নিয়ে আসার মহৎকর্মটিই করলেন। এটাকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। প্রাসঙ্গিকতায় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু, এড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।তা হলো,এম এম হাসানের সহধর্মিণী মুর্শিদা ফেরদৌস।যার ঐকান্তিক সহযোগিতা ও পরিচর্যায় আজকের এম এম হাসানের শৈশব শখ জগতে এতটুকুন ক্ষতি সাধন হয়নি বরং, আরও বৃহৎ আকারে করা যাওয়া সম্ভব হয়েছে।তাদের সংসারে দুই কন্যা সন্তান। লায়লাতুল হাসানা ( রোজা) ও জান্নাতুল হাতাসিনা ( রুপু)। লায়লাতুল হাসানা এবার এস এস সি পরীক্ষার্থী।
এম এম হাসানের আরও কিছু গুণাবলি রয়েছে, সেগুলোতে পরে আসছি।তার সংগ্রহ শালার জন্য আমাদের করণীয় প্রভৃতির কথায় যাওয়ার আগে ; সুপ্রিয় পাঠক-আপনাদের নিয়ে যেতে চাই

তার সংগ্রহশালায়।চলুন…

ঘরে ঢুকতেই নজরে এলো অনেক অনেক বই।যা শোবার স্হানে মাথা,পা,ডানে-বামে কোনোরকম থরে থরে সাজানো আছে। বই দিয়ে দেখা শুরু।পরতে পরতে অনেক গুছিয়ে বলার চেষ্টা করলে লেখার কলরব বেড়ে যাবে। ডাকঘর – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর বইটা প্রথম সংস্করণ ছাপা হয়, ১৩১৮ বাংলা সনে। হাসান দেখাতেই মোবাইলে স্ন্যাপ নিয়ে নিলাম। আরও কিছু স্ন্যাপ নিয়ে ছিলাম, সেগুলো পোস্টে সংযুক্ত করে দিয়েছি। একে একে কতিপয় জিনিস নিয়ে বলতে থাকি আশা করছি, সঙ্গে থাকবেন।

১৯৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীনঅস্ত্রের (জোগান দিতে)চেয়ে হাতের লেখা, ১৯৫৫ সালের সরকারি ছুটির তালিকা, পিতার সার্টিফিকেট (১৯৬১),বহু পুরাতন পোস্টাল অর্ডার,১২৭০ সালের দলিল,রূপালী ব্যাংকের স্লিপ, পুরাতন বিয়ারিং চিঠি, দাদার ছবি,১৯৫১ সালের ক্যালেন্ডার, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দিন বাজার থেকে ফিরে একজন ডাইরি লেখকের লেখা ডাইরি, বাংলাদেশের বিভিন্ন দিয়াশলাই, অসংখ্য দেশের কয়েন-টাকা,কার্ড,স্ট্যাম্প, সিনেমা রিল ফ্লিম,সাদাকালো ছবি- নেগেটিভ , ডিভিডি ফ্লিম,টর্চ লাইট, সবচেয়ে বড় খবর- ঢাকাইয়া মুসলিন কাপড়ের একটা হাসানের সংগ্রহশালায় রয়েছে।

আপনারা যারা খুলনা মহানগরীতে বসবাস করছেন, তাদের কাছে পিকচার প্যালেসের( সিনেমা হল) কথা অজানা নয়।এই পিকচার প্যালেসে একসময় শিশুদের জন্য আর্থিক সাহায্যের অনুদান সংগ্রহ করতে; সিনেমার টিকিটের সঙ্গে বাড়তি একটা টিকিট বিক্রি করে তহবিল সংগ্রহ করতো,সেই টিকিটও সংগ্রহ-শালায় রয়েছে।একাত্তরের চিঠি নামক একটা গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে এই গ্রন্থে একটা চিঠি ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়েছে। চিঠিটা ‘বুলা’ নামক এক মেয়ের লেখা। এই চিঠির আসল একটা কপি হাসানের সংগ্রহ আছে।তার মনে স্বাভাবিকভাবে উদয় হয়েছে, এটা পুরনো কাগজের দোকান থেকে সে সংগ্রহ করেছিলো তাহলে,প্রথম আলো যে কপিটি তুলে ধরেছে,এটা কোথা হতে কেমন করে এলো? বিষয়টা অতীব গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছেও মনে হয়েছে।যদি কেউ আগ্রহী হয়, তাহলে নিশ্চয়ই মূল তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ডের স্ট্যাম্প এ্যালবাম, রয়েছে এক হস্ত বিশিষ্ট দালানের ইট।যুদ্ধাপরাধী মাওলানা ইউসুফের স্বহস্তে লেখা একটা বইয়ে লেখা দু’কলম কথার সাথে স্বাক্ষরিত সহি।উল্লেখ্য, হাসানের শশুর বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের অধিবাসী। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।তার সাদাকালো ছবিটা দেখলে মনেই হবেনা যে এটা সদ্য তোলা নয়।

রোজ শনিবার, ২৮ জানুয়ারি’ ২০২৩, মাঘ’ ১৪ বাংলা’১৪২৯ – এ “প্রথম আলো”খুলনা কালেক্টরস শো” নামের প্রদর্শনী নিয়ে ‘ আছে বিরল নোট,মসলিনও’ শিরোনামে একটা প্রতিবেদন ছেপেছিল।সেখানে উল্লেখ করেছে ৩১ জন সংগ্রাহক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য (তৎকালীন)মাহমুদ হোসেন এই প্রদশর্নীর উদ্বোধন করেন।প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে প্রদর্শনী। অবশ্য, সেই লেখাতে প্রতিবেদক আলাদাভাবে খুলনাকে প্রাধান্য করেননি। সে সুযোগ হয়তো, কম রয়েছে কিন্তু, আমরা কেন অনলাইনে বা অফলাইনে বিভিন্ন আঙ্গিকে খুলনাকে তুলে আনতে পারবোনা। বলতে পারেন,সেই লক্ষ্যেই আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস।আপনারও যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসার আহবান রাখছি।

এই লেখার পূর্বে বলে এসেছি, এম এম হাসানের অন্যান্য কিছু গুণ রয়েছে, তিনি লেখালেখি করেন,করেন নাটক, সংগীত নিজে না করলেও একজন সংগীত প্রিয় মানুষ। তাই তাকে,খুলনা নাট্য নিকেতন (স্হাপিত- ১৯০০),মির্জাপুর যুব সংঘ ( ১৯৫৮),খুলনা সাহিত্য পরিষদ (১৯৬৩),জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ (১৯৮০),খুলনা,ফটোগ্রাফিক সোসাইটি ( ১৯৮৯), অগ্রদূত মুক্ত দল ( কাপ ও স্কাউট), খুলনা কালেক্টর সোসাইটি, গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষা মঞ্চ, খুলনার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। বেতার বাংলাদেশ খুলনাতেও নাটকে অভিনয় করেছেন, হাসান।

পরিশেষে, স্পষ্ট করে বলে রাখা উচিত, এই শহরে (প্বার্শবর্তী উপজেলা থেকে আগত) প্রায় আঠারো লক্ষ মানুষের বসবাস।এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুকুমার বৃত্তি চর্চার লোকসংখ্যা আর কতোই বা হবে। তাদের জন্য সুন্দর একটা প্ল্যাটফর্ম যদি সৃষ্টি না করা যায় তাহলে, আমাদের ঐতিহ্যকে আমরা নিজেরাই হত্যা করার অপরাধে অপরাধী হবো।মনে রাখতে হবে শিল্পচর্চা একটা জাতির মেরুকরণের সাথে সম্পৃক্ত।বাংলাদেশের রয়েছে,গৌরদীপ্ত ইতিহাস।সেই ইতিহাসের ধারক বাহক হয়ে স্বযতনে আমাদের -কে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে,তা-ই না!কাজেই, আমি ব্যক্তিগত অভিমত দিতে চাই,প্রদর্শনীর আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার নিবন্ধন ফি (বিগত দিনে) ৩৫০০ ছিলো, এটাকে কমানোর দরকার।

খুলনার সংগ্রহকদের তালিকায় থাকা বিভিন্ন উপাদানগুলো যাতে বিনষ্ট না হয়, সেজন্য অনুদান এবং স্থান দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।তাদের মর্যাদা রক্ষা করে সরকারিভাবে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা দরকার। আমি,কখনোই কাউকে আহত করে কিংবা অধিক আগ্রহী হয়ে অতিরিক্ত কিছু বলার পক্ষে নই।আশাবাদী, এই লেখার মধ্য আপনারা যে এম এম হাসানের তথ্য পেলেন,তাকে নিশ্চয়ই উৎসাহ জুগিয়ে আগামীর পথ প্রসস্থ করবেন।

সকলের সার্বিক কল্যাণ কামনা রাখছি।
নাসির আহমেদ।