আমার ডেক্স:নওগাঁয় প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে থাকা অবস্থায় আপন শ্যালিকাকে বিয়ে করে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় তোলা মাসুদ রানা এবার ফেসবুক লাইভে এসে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। একই সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই শ্যালিকাকে ‘তালাক’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে নিজের ভুল স্বীকার করেন তিনি। এ সময় তাকে হাত জোড় করে সবার কাছে ক্ষমা চাইতে দেখা যায়।
মাসুদ নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা। তিনি টিকটক ও এক আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন। গত রোববার সন্ধ্যায় তিনি শ্যালিকাকে (২১) বিয়ে করেন। তারা জেলার বদলগাছী উপজেলা সদরে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। সোমবার রাতে ওই যুবক ও তার দুই স্ত্রীর মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকা ছাড়া করার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ফেসবুক লাইভে ওই মাসুদ বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল প্রথম স্ত্রীকে বহাল রেখেই আপন শ্যালিকাকে বিয়ে করা। প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে করলে হয়তো এ নিয়ে আইনি বা সামাজিক প্রশ্ন উঠত না, তা আমার জানা ছিল না। অজ্ঞতার কারণে এমন ভুল হয়েছে আমার। যদি বুঝতাম এমন সম্পর্ক সমাজের চোখে অপরাধ এবং ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম, তবে আমরা কখনোই এ ধরনের ঘটনা ফেসবুকে প্রকাশ করতাম না। বুঝে-শুনে কেউ আগুনে হাত দেয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সমাজ ও পরিস্থিতি যেভাবে চাইবে, আমি এখন সেভাবেই জীবন পরিচালনা করবো। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের নিয়ে ছবি ও ভিডিও প্রচার বন্ধ করার অনুরোধ রইলো। যাকে বিয়ে করেছি, সেই শ্যালিকাকে আমি তালাক দেবো।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার সদর ইউনিয়নের বৈরাগীপাড়ায় প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন মাসুদ। গত ২৪ অক্টোবর ওই বাসায় আপন শ্যালিকার সঙ্গে তার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান হয়। পরদিন ২৫ অক্টোবর প্রথম স্ত্রীর আপন ছোট বোনকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের পর এ ঘটনার পক্ষে সাফাই গেয়ে ওই যুবক দাবি করেছিলেন, ‘প্রথম স্ত্রীর সম্মতি ও সহযোগিতাতেই তিনি এ বিয়ে করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শ্যালিকার অন্যত্র বিয়ে হলে তাদের আগে ধারণ করা কিছু টিকটক ভিডিও নিয়ে তাকে হয়রানির শিকার হতে হতো- এমন আশঙ্কা থেকে তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন।’ বিয়ের পর দুই স্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ইসলাম ধর্মে একসঙ্গে দুই বোনকে স্ত্রী হিসেবে রাখার বিধান নেই- উল্লেখ করে বদলগাছীতে তারা যে বাসায় ভাড়ায় থাকতেন, সেই বাসা ছেড়ে দিতে বলা হয়।
এ ঘটনার জেরে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে মহাদেবপুর উপজেলার মাতাজি বিরামগ্রাম এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতিতে শ্যালিকাকে বিয়ে করার প্রতিবাদে স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা ওই লোক ও তার দুই স্ত্রীর মুখে চুনকালি মাখিয়ে এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকা ছাড়া করেন।
পবিত্র কোরআনে দুই বোনকে একসঙ্গে স্ত্রী হিসেবে রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোরআনে এসেছে, এ ব্যাপারে তোমাদের প্রতি হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা এবং মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাইঝি, ভাগিনী, দুধ মা, দুধ বোন, শ্বাশুড়ী, তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যার সাথে সঙ্গত হয়েছ তার পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত মেয়ে যারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে আছে, কিন্তু যদি তাদের সাথে তোমরা সহবাস না করে থাক, তবে (তাদের বদলে তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে করলে) তোমাদের প্রতি গুনাহ নেই এবং (তোমাদের প্রতি হারাম করা হয়েছে) তোমাদের ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী এবং এক সঙ্গে দু’ বোনকে (বিবাহ বন্ধনে) রাখা, পূর্বে যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, দয়ালু।
(সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৩)
ফলে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি থাকলেও এ বিয়ে ইসলামে বৈধ নয়। ফলে বড় বোনকে বৈবাহিক সম্পর্কে রেখে শ্যালিকাকে বিয়ের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের আপত্তি ও ভাড়া বাসায় থাকতে না দেওয়ার হুমকির মুখে সোমবার সন্ধ্যায় বদলগাছী ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নেন মাসুদ রানা (৩৫)। তার সঙ্গে ছিলেন প্রথম স্ত্রী মৌসুমী (২৮) ও শ্যালিকা (কথিত স্ত্রী) পূর্ণিমা (২১)।
ইসলামী বিধানের বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা রেজাউল করিম বলেন, পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে দুই বোনকে একই সময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তার ভাষ্য, একজন স্ত্রী বৈবাহিক সম্পর্কে থাকা অবস্থায় তার বোনকে বিয়ে করা যায় না। তবে প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হলে কিংবা বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর নির্ধারিত বিধান অনুসারে তার বোনকে বিয়ের বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে।
এদিকে অনেকেই বলছেন, স্ত্রী থাকা অবস্থায় তার বোনকে বিয়ে করা যেহেতু বৈধই হয়নি, তাই তালাকেরও প্রশ্ন ওঠে না।
Md.Liton 








